দেশের প্রথম নারী ইউরোলজিস্ট

 

বাংলাদেশ শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে (বিএসএমএমইউ) পড়ার সময় ২০০০ সাল ইউরোলজির অধ্যাপক ডা. এমএ সালামের সঙ্গে পরিচয় হয় তাজকেরা সুলতানার। ডা. এমএ সালাম সবসময় বলতেন মেয়েদের ইউরোলজিতে আসা উচিত। মূলত স্যারের সেই কথাগুলোই পরবর্তীতে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে তার ক্ষেত্রে।
বিসিএসে চাকরি হয় ২০০৩ সালে, এর আগে বারডেমে আউটডোর মেডিকেল অফিসার ইউরোলজি পদে আবেদন করেন। একজন মহিলা প্রফেসর সব কাগজ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আবেদন করেছেন কেন? আমরা তো এখানে মহিলা ডাক্তার নেব না। কারণ হিসেবে জানালেন, পুরুষ রোগীরা তো আপত্তি করবেন। ধরেই নেয়া হয়েছে, এখানে কোনো মহিলা চিকিত্সক আবেদন করবেন না। তাজকেরা সুলতানা তাকে অনুরোধ করেন, আমাকে নিয়োগ না করেন, অন্তত যেন পরীক্ষা দিতে দেয়া হয়। ইন্টারভিউ বোর্ডে তিনি মহিলা রোগীদের কথা তুলে ধরে বলেন, পুরুষ ডাক্তার হলে তারা কী করবে? তার এ প্রশ্ন শুনে দায়িত্বরত অধ্যাপক জানান, বেশির ভাগ রোগীর কথা ভাবতে হবে, এখানে বেশির ভাগ রোগী পুরুষ। পাল্টা প্রশ্নে তাজকেরা বলেন, উল্টোটাও তো হতে পারে।
শেষমেশ সফল হননি তিনি। মহিলা রোগীরা পুরুষ চিকিত্সকের কাছে যেতে বাধ্য— এ কথা মনে করে মন খারাপ করে চলে আসতে হয়েছে তাকে। তবে ব্যর্থতাই যে সফলতার চাবিকাঠি, তাজকেরা তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। সেই ঘটনার পর ডা. এমএ সালাম স্যারের কাছে এসে সব খুলে বলেন। সবকিছু শুনে কাজ চালিয়ে যেতে উত্সাহ দেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের দিকে জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চেম্বার খোলেন তাজকেরা।
তিনি বলেন, ‘শুরুতে ইউরোলজির জটিল রোগীদের চিকিত্সা করতে পারতাম না। সে সময় তাদের পুরুষ ডাক্তারের কাছে রেফার করতে হতো।’ নিজে থেকেই ভাবতে শুরু করেন ডাক্তার হিসেবে কিছুই করতে পারছেন না। তবে একবার একটি ঘটনা ঘটে। কেরানীগঞ্জ থেকে দুজন মহিলা রোগী আসেন তার কাছে। তারা একটু বেশি পর্দানশীন হওয়ায় জটিল সমস্যা নিয়েও পুরুষ চিকিত্সকের কাছে যেতে চাইছিলেন না। তারা মরে যাবেন, তবু পুরুষ চিকিত্সক দেখাবেন না। এভাবে বেশ কয়েক জন রোগী তার কাছে আসেন।
এবারো বিএসএমএমইউতে ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এমএ সালাম স্যারের দ্বারস্থ হলেন তাজকেরা। তাকে গিয়ে বিষয়টি বললেন। তিনি উত্সাহ দিলেন। সে বছরই পরীক্ষা দিলেন তাজকেরা সুলতানা। পরের বছর ২০১০ সালে তিন বছরের কোর্স শুরু করলেন। ২০১২ সালে কোর্স শেষ করে তিনি এখন পুরোদস্তুর ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ।
সে দিনগুলোর কথা মনে করে তাজকেরা বলেন, ‘সে সময় পরিবারের চিন্তা ছিল ভালো চিকিত্সা করছে আর ডিগ্রি নেয়ার কী দরকার? বিএসএমএমইউতে আমার সঙ্গে আরেকজন মহিলা ডাক্তার ছিলেন নাহিদ পারভিন লোপা। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। তা না হলে দুজন একসঙ্গে বের হতাম। পাস করার পর ২০১৩ সাল থেকে ইউরোলজির বিষয়ে প্রাইভেট প্রাকটিস শুরু করি খিলগাঁওয়ের খিদমা হাসপাতালে। বর্তমানে ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালে জেনারেল সার্জন হিসেবে চিকিত্সা করছি। ইউরোলজির চিকিত্সাসেবা দিচ্ছি গ্রিন রোডের কমফোর্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও।’
সারা দেশ থেকেই রোগী আসে
তাজকেরা সুলতানার কাছে। সার্জারির রোগীও দেখেন। তবে বেশির ভাগ
রোগী আসে ইউরোলজি-সম্পর্কিত সমস্যার পরামর্শের জন্য। ক্যান্সার, মূত্রনালিতে পাথর, প্রস্রাবের সমস্যা-সংক্রান্ত রোগীরা বেশি হয় তার। সারা বিশ্বেই মহিলা ইউরোলজিস্টের সংখ্যা কম। বাংলাদেশে একজন নয় কমপক্ষে এক হাজার মহিলা ইউরোলজিস্ট দরকার। জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, তাদের মধ্যে আক্রান্ত রোগীরা গাইনিকোলজি কিংবা মেডিসিন ডাক্তারের কাছে যান। তারা চিকিত্সকের কাছে আক্রান্ত স্থান প্রকাশ করেন না। তাদের যে সমস্যা তার থেকে কম বা বেশি চিকিত্সা হয়। যেহেতু শুনে শুনে না দেখে চিকিত্সা করছেন, সেহেতু ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাজকেরা বলেন, এখন অনেক মেয়ে মেডিকেলে পড়ে। বিষয় নির্বাচনে ইউরোলজি ভাবনায় আনার জন্য
অনুরোধ করছি। এখনকার
পরিস্থিতিতে ইউরোলজিতে মহিলা চিকিত্সক নেই। এ বিষয়ের রোগীরা গাইনি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়। তারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন। সার্জন হওয়ার পরও চিকিত্সাসেবা দিতে পারতাম না। সারা বিশ্বেই স্পেশালিস্ট থেকে সুপার স্পেশালিস্ট তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে গাইনি বিশেষজ্ঞদের ইউরোলজির ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে, অর্থাত্ ইউরো-গাইনিকোলজি। কারণ ইউরোলজির প্রথম পর্যায়ের রোগীরা গাইনি ডাক্তারের কাছে যান। সারা বিশ্বের বেশির ভাগ গাইনি ডাক্তার এ বিষয়টি দেখভাল করেন। এটা একটা যৌথ চিকিত্সাসেবা।